পোল্ট্রি শিল্পে ক্ষতি ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা

করোনাভাইরাসের থাবায় বড় ধরনের ধস নেমেছে দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এর প্রভাবে এখন পর্যন্ত দেশীয় এই শিল্পের ডিম, বাচ্চা ও ব্রয়লার মুরগি—এ তিনটিতে প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মুরগির দাম কমে যাওয়ায় এক দিন বয়সী বাচ্চার চাহিদায় ধস নেমেছে। এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দাম মাত্র দুই টাকায় নেমে এসেছে, যেখানে একটি বাচ্চার উৎপাদন খরচ প্রায় ৩৫ টাকা। তার পরও কেনার মতো খামারি পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ খামারিরা বাচ্চা ওঠালে তাকে খাওয়াতে হবে। বিদ্যুৎ, শ্রমিক ছাড়া অন্যান্য খরচও রয়েছে। কিন্তু মুরগির মাংস বিক্রি করতে হচ্ছে অনেক লোকসান দিয়ে। কিছুদিন আগে একেকটা ডিম আট টাকা করে বিক্রি হয়েছে। এখন তা অর্ধেকে নেমে সাড়ে চার টাকা থেকে পাঁচ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। একটি ডিমের উৎপাদন খরচ হচ্ছে প্রায় ছয় টাকা। ব্রয়লার মুরগির ব্যবসায়ও নেমেছে ধস। খামারিরা ব্রয়লার মুরগি এখন ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন, যেখানে এক কেজি ওজনের ব্রয়লার মুরগির পেছনে খরচ হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা। এ অবস্থা চলতে থাকলে স্থবির হয়ে যেতে পারে দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮০ হাজার পোল্ট্রি খামারে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে।

সিলেট সুরমা পোল্ট্রির মালিক ফয়েজ রাজা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন খুবই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। কয়েক দিন ধরে ব্রয়লার মুরগি নিয়ে বসে রয়েছি কিন্তু কোনো ক্রেতা বা পাইকার পাচ্ছি না। বাধ্য হয়েই এখন যা দাম পাচ্ছি তাতেই বিক্রি করতে হচ্ছে। লসের কারণে মুরগির খাবার জোগান দিতে পারছি না, তাই শেড (মুরগির ঘর) খালি করার জন্য বিক্রি করতে হচ্ছে। এখন পাইকারি ডিম বিক্রি করছি পাঁচ টাকা করে। কিন্তু ডিমপ্রতি খরচ আছে ছয় টাকা। হ্যাচারির মালিকরা একদম অল্প দামে বাচ্চা দিতে চাচ্ছে কিন্তু আমরা নিচ্ছি না, কারণ এমনিতেই তো অনেক লসের মধ্যে রয়েছি। এখন বাচ্চা নিলে আমাদের মরতে হবে। বর্তমানে সারা দেশের খামারিদের অবস্থা ঠিক আমার মতোই। এর আগে অনেক পোল্ট্রি খামারি এভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। এভাবে চলতে থাকলে দেশের প্রান্তিক খামারিদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

খুলনা ইস্টার্ন পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিড প্যালেসের মালিক এস এম সোহরাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন প্রতি কেজি ব্রয়লার ৬০ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারছি না। খরচ হয়েছে কেজিতে ৯০-৯৫ টাকা। ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে চার টাকা করে। আমরা খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছি। এ অবস্থায় সরকারের প্রণোদনা চাই। না হলে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।’

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. মনজুর মোরর্শেদ খান কালের কণ্ঠকে জানান, করোনার কারণে দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পে এরই মধ্যেই ভয়াবহ ধস নেমেছে। শুধু ডিম, বাচ্চা ও ব্রয়লার মুরগি—এ তিনটিতেই প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয়েছে এ শিল্প। এক কেজি ওজনের ব্রয়লার মুরগির পেছনে ৯০ থেকে ১০০ টাকা খরচ করে এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০ টাকায়। মুরগির দাম কমে যাওয়ায় এক দিন বয়সী বাচ্চার চাহিদায় ধস নেমেছে, বাচ্চার দাম মাত্র দুই টাকায় নেমে এসেছে, যেখানে একটি বাচ্চার উৎপাদন খরচ প্রায় ৩৫-৪০ টাকা। তার পরও কেনার মতো খামারি পাচ্ছেন না হ্যাচারির মালিকরা। এখন বিনা মূল্যে বাচ্চা নিয়েও কেউ খামার চালু রাখতে চান না। কারণ বাচ্চা ওঠালে তাকে খাওয়াতে হবে। সব মিলিয়ে বড় সংকটে পড়েছে দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প। এ সংকট মোকাবেলার জন্য বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। যাঁরা ক্ষতির সম্মুখীন তাঁদের নগদ আর্থিক সহায়তা এবং যাঁরা ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তাঁদের ঋণের সুদ মওকুফ করে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

এদিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকালীন দুধ, ডিম, মাছ ও মাংসসংক্রান্ত সংকট মোকাবেলায় সরকার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এমপি। গতকাল বুধবার রাজধানীর বেইলি রোডের সরকারি বাসভবন থেকে মন্ত্রী করোনায় পোল্ট্রি ও দুগ্ধ শিল্প এবং মৎস্য খাতের সংকট মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে এসব তথ্য জানান।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...