২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭


হোম   »   কৃষি তথ্য   »   কৃষি সংবাদ  
কৃষিতে ৫৫ দফা সুপারিশ

কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট (২০১২-১৩)

যুগ যুগ ধরে নীতি পরিকল্পনার জায়গায় কৃষি থেকে গেছে উপেক্ষিত। সামাজিক নীতি, শাসন ও সহযোগিতার গতি বরাবরই উপর থেকে নীচের দিকে ধাবিত হয়েছে। বাতির গোড়া থেকে গেছে অন্ধকারে। প্রতিবছর জাতীয় সংসদে ঘোষিত জাতীয় বাজেটের মধ্য দিয়ে ধার্য হয় একটি অর্থবছরের জাতির অর্থনৈতিক নীতি পরিকল্পনা ও হিসাব নিকাশ। দেশের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, যারা আইন প্রণেতা তাদের মাধ্যমেই পাশ হয় জাতীয় বাজেট। কিন্তু বাত্সরিক সেই হিসাব খাতায় ভাগ্যে কতখানি কী জুটলো যুগ যুগ ধরে তা টেরই পাননি কৃষক। কারণ, নীতি পরিকল্পনার জায়গায় আগ্রহী করে তোলা হয়নি কৃষককে। কৃষক কোনোদিন চিন্তাও করে দেখেনি, জাতীয় বাজেট সমাজের আর সবার মত তাদেরও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মূল ফর্দ। সে থেকেছে আড়ালেই। এই চিন্তা থেকেই ২০০৫ সালে জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে চ্যানেল আই-এর হূদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে শুরু করা হয় বাজেট সম্পর্কে কৃষকের ধারণা নিরূপণের গণমাধ্যম জরিপ ও প্রকাশ্য গবেষণা। তার পরের বছর থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হয় প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাক-বাজেট আলোচনার রেওয়াজ, যা মূলত একটি সরেজমিন ও বৈঠকি জরিপ কাজ এবং প্রকাশ্য আলোচনা। মুক্ত আকাশের নীচে কয়েক হাজার কৃষকের মুখ থেকে কৃষির সমস্যা, সংকট, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি চাহিদা ইত্যাদি বের করে আনার একটি প্রয়াস।

রাষ্ট্রীয় নীতি, পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক বিবরণীতে কৃষকের এই বাস্তবসম্মত চিন্তা, সুপারিশ, বঞ্চনা ইত্যাদি উঠে আসুক, এই প্রত্যাশায় দিনের পর দিন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয় দেশের কৃতি অর্থনীতিবিদদের। ২০০৭ সাল থেকে যুক্ত করা হয় রাষ্ট্রের কৃষি ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের। একই সঙ্গে উদ্যোগ নেওয়া হয় জাতীয় বাজেটের আগে সরকারের কাছে কৃষকদের মাঠ পর্যায়ের এই কণ্ঠস্বর লিখিত সুপারিশ ও প্রস্তাবনা আকারে পেশ করার। ২০০৬ সাল থেকে সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রীর মাধ্যমে ওই সুপারিশমালা তুলে ধরা হচ্ছে সরকারের কাছে। এবার চলছে কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমের অষ্টম বছর। দেশের কুমিল্লা, যশোর, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ ও টাংগাইলে সব ক’টি জেলা মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার কৃষকের এই আলোচনায় যথাক্রমে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, প্রধান তথ্য কমিশনার মোহাম্মদ জমির ও বিশিষ্ট কলামিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। এসব আলোচনায় কৃষকরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে উপকরণের চড়া মূল্য এবং বিভিন্ন কৃষি পণ্যের মূল্য না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন তারা।

১. উত্পাদন ব্যয় কমানো, লাভে কৃষি পণ্য বিক্রির নিশ্চয়তা বিধান (প্রয়োজনে ভর্তুকি না দিয়ে ১০ শতাংশ লাভে কৃষি পণ্য বিক্রির অনুকূল বাজার সৃষ্টিকরণ): কৃষি উপকরণ ব্যয়সহ সার্বিক উত্পাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। উত্পাদন ব্যয়ের সঙ্গে কৃষি পণ্যের বাজারমূল্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গত বছরের বোরো মৌসুম থেকে বিভিন্ন ফল ফসলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এ অবস্থার পরিবর্তনে সারসহ সকল কৃষি উপকরণের মূল্য কৃষকের ক্রয়সাধ্যের মধ্যে আনার সুপারিশ করেছেন ৬টি জেলার ধারণকৃত কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে উপস্থিত ৯০ শতাংশ কৃষক। কৃষকরা এও বলেছেন, প্রয়োজনে ভর্তুকি দেবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রত্যেক কৃষি পণ্য উত্পাদন ব্যয় বাদ দিয়ে কমপক্ষে ১০ শতাংশ লাভে বিক্রির জন্য অনুকূল বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

২. কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ ও ঢেলে সাজানো: প্রচলিত কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা ও কাঠামোর আওতায় আধুনিক ও উচ্চমূল্যের ফল ফসল আবাদের ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ থেকে কৃষক তেমন সুবিধা, সহযোগিতা ও পরামর্শ পাচ্ছেন না। দিনের পর দিন কৃষি বিভাগের সঙ্গে কৃষকের ব্যবধান দীর্ঘ হচ্ছে, এমনকি কৃষি বিভাগের প্রতি তাদের আস্থাও কমে যাচ্ছে। কৃষক বীজ, সার, কীটনাশক ও উচ্চমূল্যের ফল ফসল আবাদের কৌশলের প্রশ্নে কৃষি বিভাগের নানামুখি সহায়তা প্রত্যাশা করেও পাচ্ছেন না। ৮০ ভাগ কৃষকের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বড় ও সফল কৃষকের দোরগোড়ায় যান, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা তাদের পরামর্শ সেবা পান না। এক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের কর্মীদের নেই উন্নত প্রশিক্ষণ। তাছাড়া প্রচলিত ব্যবস্থায় তারা একসঙ্গে অনেক কৃষকের কাছে কোনো তথ্য পৌঁছাতে পারছেন না। তাই কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ বাড়াতে হবে, সে সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করতে হবে।

৩. কৃষি বিষয়ে বিষেশায়িত প্রচার মাধ্যম: বর্তমান সময়টি তথ্য প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের বিকশিত একটি সময়। কৃষকরা তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেছেন। গণমাধ্যমের বিভিন্ন কার্যক্রমের সুবাদেও তাদের তথ্যের ক্ষুধা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কিত জ্ঞান থেকে শুরু করে কৃষির বিভিন্ন বিষয়াদি সম্যকভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়ার স্বার্থে একটি বিশেষায়িত টেলিভিশনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন কৃষকরা। এবার কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে একাধিক আলোচনায় কৃষকরা এই প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তথ্য প্রযুক্তির বিকশিত এই সময়ে কৃষি বিশেষায়িত একটি টেলিভিশন চ্যানেল শুরু করার ব্যাপারে সরকারি পদক্ষেপের জন্য সুপারিশ করছি।

৪. কৃষিতে জরুরি ভিত্তিতে বীমা ব্যবস্থা প্রবর্তন: পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতি ও দুর্যোগ ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে কৃষকরা বহুদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন শস্য বীমা ব্যবস্থা প্রবর্তনের। বিষয়টি একাধিকবার সরকারের কাছে তুলে ধরার প্রেক্ষিতে মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে সরকারের সুবিবেচনার আশ্বাস দেন। বিগত ২০১১-১২ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কার্যত এখনো শস্য বীমা বা ক্রপ ইন্সুরেন্স এর বিষয়টি বাস্তবায়ন হয়নি। আসন্ন জাতীয় বাজেটে শস্য বীমার একটি কার্যকর রূপরেখা ও এ সংক্রান্ত বরাদ্দ থাকবে বলে আমরা আশা করছি। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রতিবেশী দেশ ভারতে কৃষিতে তিন ধরনের বীমা অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এক. ন্যাশনাল এগ্রিকালচার ইন্স্যুরেন্স স্কিম, দুই. ওয়েদার বেজড ক্রপ ইন্স্যুরেন্স স্কিম এবং তিন. হাইব্রিড ইন্স্যুরেন্স মেকানিজম। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ঝুঁকিকে কেন্দ্র

করেই শস্য বীমা ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সরকার বিবেচনায় আনবে বলে আশা করছি। সেই সঙ্গে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা তথা মধ্যস্বত্বভোগী ও মহাজনী শোষণ থেকে কৃষকদেরকে রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং সুইজারল্যান্ডের আর্থিক সহযোগিতায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত কর্মসূচি শস্য গুদাম ঋণ প্রকল্প (শগুঋপ) -এর কার্যক্রম দেশব্যাপী সমপ্রসারিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা। চলতি বজেটে শস্য বীমার বিষয়টি উল্লেখিত থাকলেও বাস্তবার্থে তেমন কাজ হয়নি।

৫. বিএডিসির বীজ উত্পাদন সাধ্য ও মনিটরিং বাড়াতে হবে: বীজ নিয়ে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি সংকটে আছে। বিএডিসির বীজ সরবরাহ সাধ্য অনেক কম হওয়ায় কৃষকরা বাইরের বীজের ওপর নির্ভর করছেন। প্রতিনিয়ত ভেজাল ও নিম্নমানের বীজের কারণে প্রতারিত হচ্ছেন তারা। এই প্রতারণা ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য

বিএডিসির বীজ উত্পাদনের পরিধি ও সাধ্য অনেক বেশি বাড়াতে হবে। কৃষকদের মধ্য থেকে চুক্তিবদ্ধ বীজ উত্পাদকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে বিএডিসির মাধ্যমে কৃষকদেরকে বিভিন্ন সহায়তা ও ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে।

বেসরকারি কোম্পানির বীজ বিক্রি ও সরবরাহে কঠোর মনিটরিং-এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি কোম্পানির বীজ ব্যবহার করে প্রতি বছর কৃষক প্রতারিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকছে। বেসরকারি কোম্পানির বীজ বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের দায়বদ্ধতা যুক্ত করতে হবে।

৬. কৃষি গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে: কৃষি গবেষণায় বিগত চার অর্থবছরের এনডাওমেন্ট তহবিল তেমন কোনো উপকারে আসছে না। বস্তুত তা কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনে ব্যবহূত হলেও কার্যকর কৃষি গবেষণায় তা বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারছে না। কৃষি গবেষণায় পৃথকভাবে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। দেশের কৃষি সংশ্লিষ্ট সকল গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ সুবিধা, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও প্রযুক্তি সুবিধার অভাবে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে পারছেন না। বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে আনা প্রয়োজন।

৭. দুর্যোগ সহনশীল ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জাত সম্প্রসারণে আরো কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে: বন্যা, খরা, লবণ ও শৈতসহিষ্ণু ধানের জাত নিয়ে গবেষণা চলছে বিগত কয়েক বছর ধরে। কিন্তু জাতগুলো এখনো কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছেনি। দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত লবণসহিষ্ণু জাতের চেয়ে উপকূলীয় এলাকায়

স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা পুরানো লবণসহিষ্ণু জাতগুলোর কার্যকারিতা অনেক বেশি বলে প্রমাণিত হচ্ছে। কৃষকদের সংগৃহীত ধানের জাতগুলো নিয়ে অংশগ্রহণমূলকভাবে জাত উন্নয়ন গবেষণা করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ ও নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

৮. কৃষি পণ্য সরবরাহের সুবিধার্থে অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব ও বরাদ্দ: দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপ্রয়োজনীয় বহু অবকাঠামো রয়েছে। রয়েছে শত শত সেতু ও সড়ক। বিভিন্ন সরকারামলের অপরিকল্পিত উন্নয়ন কাজের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি টাকা গরচা গেছে। অথচ দেশের কৃষিসমৃদ্ধ এলাকাগুলোতে এখনো কৃষি পণ্য সরবরাহের প্রশ্নে অবকাঠামো সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার উন্নয়ন না হওয়ায় পণ্য পরিবহনে কৃষক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, অন্যদিকে পাচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য। এক্ষেত্রে দেশের সকল এলাকায় কৃষির জন্য গুরুত্ব বিবেচনা করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাস্তা, সেতু উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

৮। (ক) দেশের চরাঞ্চলগুলো বছরের পর বছর পতিত থাকার পর বিগত কয়েক বছরে কৃষি আবাদে ব্যাপক সাফল্য সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা ও স্থানীয় এনজিওর মাধ্যমেও বিভিন্ন উন্নত কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার হচ্ছে চরাঞ্চলে। দেশের মোট আয়তনের ৭ ভাগ চরাঞ্চলকে ব্যাপক ভিত্তিক কৃষি আবাদের আওতায় আনার স্বার্থে চরাঞ্চলের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।

৯. তিন ফসলি কৃষি জমিকে অকৃষি খাতের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে হবে: ইতোমধ্যেই সরকার ভূমি ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। কিন্তু তারপরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় তিন ফসলি কৃষি জমিতে অকৃষি স্থাপনা, কলকারখানা, আবাসন তৈরি তত্পরতা এখনো বন্ধ হয়নি। ঢাকার আশপাশের কয়েকটি জেলা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে শুরু করে দেশের অনেক জেলায় কৃষি জমি ব্যাপকহারে কমতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই ১৬০ উপজেলায় সরকারের ল্যান্ড জোনিং প্রজেক্টের কাজ প্রায় শেষের পথে। কিন্তু তারপরেও ভূমি ব্যবহারের কোনো নীতিমালাই কেউ মানছেন না। এ ব্যাপারে সরকারের আরো শক্তিশালী উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্রাম পর্যায়ে কৃষকদের জন্য স্বল্প ব্যয়সম্পন্ন আবাসন ব্যবস্থা করা গেলে ফসলি জমিতে বাড়িঘর করার প্রবণতা কমবে। এক্ষেত্রে সরকারের স্থানীয় সরকার ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কৃষি ভূমি রক্ষা করে স্বল্প ব্যয় সম্পন্ন আবাসন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।

১০. শিল্প বর্জ্যের দূষণ থেকে বাঁচাতে হবে মাটি, পানি ও বাতাসকে: পরিবেশ দূষণ ও কলকারখানার বর্জ্য থেকে কৃষি জমি, জলাশয়, বনভূমিসহ সামগ্রিক পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে। গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত কলকারখানাগুলো কোনোভাবেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ম মেনে চলছে না বিধায় বিষাক্ত বর্জ্যের প্রভাবে একরের পর একর কৃষি জমির জৈব শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী পরিণত হয়েছে মেগাসিটি ঢাকার ভাগাড়ে। নদীর পানিতে মাছসহ সকল জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ নিঃশেষ হয়ে গেছে। মারা যাচ্ছে গবাদিপশু। একই সমস্যার মধ্যে পড়েছে কর্ণফুলি নদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপাজেলা শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলো। যতদূর ক্ষতি হয়েছে তা থেকে বাঁচার জন্য বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার আলোকে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে মাটি, পানি ও পরিবেশ শুদ্ধিকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। এবারের কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে কুমিল্লায় ইপিজেড এর শিল্পবর্জ্যের দূষণে শহর থেকে ৬ কিলোমিটার এলাকার আবাদি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিক্ষুদ্ধ কৃষকদের দাবি এই দূষণ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মানিকগঞ্জে পৌরসভার ডাস্টবিন নির্মাণ করা হচ্ছে কৃষি জমি দখল করে, যার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন কৃষকরা। প্রত্যেক কৃষি আবাদি এলাকার মাটি, পানিসহ সার্বিক পরিবেশকে যেকোনো ধরনের দূষণের হাত থেকে রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।

১১. কয়েকটি কৃষি পণ্যের ভিত্তিমূল্য সরকারিভাবে নির্ধারণ ও কৃষক পর্যায়ে পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন: ধান, পাট, আখ, আলু ও ভুট্টার মত গুরুত্বপূর্ণ ফসলের মূল্য সার্বিক বিবেচনা সাপেক্ষে সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, কৃষক ও ভোক্তা উভয় পর্যায়েই কৃষি পণ্যের

ন্যায্যমূল্য নেই। কৃষক পাচ্ছেন কম দাম, ভোক্তা কিনছে বেশি দামে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষি পণ্যের পাইকারি বাজার, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ও সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার দিকে জোর দিতে হবে।

ভারতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এগ্রিকালচার কস্টিং এন্ড প্রাইস কমিশন রয়েছে। ওই দপ্তরটি প্রধান প্রধান কৃষি পণ্যের উত্পাদন ব্যয় ও কৃষক পর্যায়ে সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। একই দপ্তরের অধীনে ‘মিনিকিট’ কার্যক্রম প্রচলিত রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে রয়েছে ‘কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র’। ওই কেন্দ্র আগ্রহী কৃষকদেরকে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের আওতায় এনে পণ্য উত্পাদন করে এবং বিক্রির নিশ্চয়তা বিধান করে। এসব উদাহরণ পরিমার্জন ও আমাদের উপযোগী করে বাস্তবায়নের ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পারে সরকার। এক্ষেত্রে কমোডিটি এক্সচেইঞ্জ ও ডেরিভেটিভ মার্কেটিং ব্যবস্থা চালু করার জন্য সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কার্যত কোনো কার্যকারিতাই নেই। কৃষক এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোনোভাবেই উপকৃত নয়। এ প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজাতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যশোরে আঞ্চলিক কৃষি বিপণন কেন্দ্রের স্থাপনা ও কার্যক্রম অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সেটি জরুরি ভিত্তিতে চালু করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষক নিয়ন্ত্রিত ও মধ্যস্বত্বভোগীমুক্ত চাষি বাজার স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। উল্লেখ্য, গত তিন বছর এই একই প্রস্তাবনা মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়েছে। তিনি বিষয়টি সুবিবেচনাতেও আনেন। কিন্তু দেশব্যাপী এর কার্যকর কোনো কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।

১২. সার্বিকভাবে জৈব কৃষি বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে: জৈব কৃষির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চফলনশীল ফসল আবাদ করতে গিয়ে কৃষকরা বছরের পর বছর মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে মাটির জৈব উপাদান যেমন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একইভাবে কীটনাশক জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে, যার আনুমানিক দাম ৫০ হাজার কোটি টাকা। সরকার নিষিদ্ধ ৫০টিরও অধিক কীটনাশক এখনো বাজারে বিক্রি হচ্ছে। ভেজাল কীটনাশকেও বাজার ছেয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো সরকারের কার্যকর দৃষ্টিতে আনতে হবে। কীটনাশক আমদানি, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে সেক্স ফেরোমেন ট্রাপের মত জৈব পদ্ধতি ব্যবহার সম্প্রসারণের সুবিধার্থে, এসব জৈব কীটনাশকের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সরকারিভাবেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে গ্রামীণ নারীরা জৈব সার (কেঁচো কম্পোস্ট) উত্পাদনের জন্য সরকারের বিশেষ ঋণ ও অনুদান সহায়তা চেয়েছেন। বিষয়টি বিবেচনায় আনার জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

১৩. ইউনিয়ন পর্যায়ে মাটি পরীক্ষা ল্যাব স্থাপন: প্রাকৃতিক ও মানুষসৃষ্ট নানা কারণসহ একই জমিতে বারংবার উচ্চফলনশীল ফসল আবাদের কারণে মাটির উর্বরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। উপরোন্তু বর্তমান সময়ে উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ফসল আবাদের জন্য মাটির জৈব উপাদানের হার নির্ণয় করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক কৃষকের আবাদি ক্ষেতের মাটি পরীক্ষার জন্য অন্ততঃপক্ষে ইউনিয়ন পর্যায়ে মাটি পরীক্ষা ল্যাব স্থাপনে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে।

১৪. কৃষিক্ষেত্রে নব্য প্রচলিত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার পরীক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে: দেশে কল সেন্টার, মোবাইল কোম্পানিসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কৃষিতে তথ্য সেবা চালু করেছে। এটি সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষক ওইসব মাধ্যম থেকে কার্যকর সেবা পাচ্ছেন না বরং কৃষক বিভিন্নভাবে হয়রানি ও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে ওইসব সেবাপ্রদানকারী সংস্থার সমন্বয়ে সবধরনের কৃষি সমস্যার তাত্ক্ষণিক ও বিনামূল্যে সমাধান দেয়ার জন্য একটি বিশেষ স্টেশন তৈরি করতে হবে। সেখানে একাধিক টোলমুক্ত ফোনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে চালু হওয়া কৃষি তথ্য সেবা কেন্দ্রের সঙ্গে কৃষি তথ্য সার্ভিসের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি তথ্য সেবায় এবার বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।

১৫. ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রকে কার্যকর করতে হবে: দেশের চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদে কম্পিউটারাইজড্ ই-তথ্য সেবা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ কেন্দ্র ও তাদের কাজ সম্পর্কে কৃষকদের ধারণা নেই। কৃষক সেখান থেকে কার্যত সেবাও পাচ্ছেন না। দেশের সকল ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রকে কার্যকরভাবে চালু করতে হবে। ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রের তথ্য সহায়কের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির কার্যকর প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। সে সঙ্গে নিয়মিত ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদে তথ্য বিষয়ক উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

১৬. সবজি ও ফল ফসলের জন্য হিমাগার স্থাপন: সবজি ও ফল ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য অন্তত প্রত্যেক জেলায় একটি করে হিমাগার স্থাপন করতে হবে। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মৌসুমে কৃষক তার সবজি ও ফলের ন্যায্যমূল্য পান না। অনেক সময় বিভিন্ন সবজি ফসলের মূল্য একেবারে পড়ে যাওয়ার কারণে কৃষকের ক্ষেতেই পচে নষ্ট হয় হাজার হাজার টন সবজি। কৃষক বাধ্য হয়ে বাজারে নিয়েও সেগুলো পায়ের নীচে ফেলে নষ্ট করতে বাধ্য হয় এমন নজিরও আছে। এ অবস্থার অবসানকল্পে সবজি উত্পাদনে সফল প্রধান প্রধান জেলাগুলোতে একটি করে হিমাগার থাকলে সারা বছর সবজির মূল্য কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের কাছেই লাভজনক করে তোলা সম্ভব।

১৭. মধু চাষে ঋণের ব্যবস্থা সুগম করতে হবে: ২০১০-১১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের প্রাক্কালে চাষিদের উত্থাপিত দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ কাঠামোর আওতায় মধু চাষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু পরে মৌ চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ ব্যবস্থা চালু না করার কারণে এর সুফল আসেনি। মৌ চাষিরা সহজ শর্তে ঋণ চান।

১৮. লবণ চাষকে কৃষির আওতায় আনা ও পৃথক একটি লবণ বোর্ড গঠন: লবণ উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। কিন্তু সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা না থাকা এবং এই খাতের গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন না করার কারণে দিনের পর দিন চাষিরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। প্রতি বছরই লোকসান গুনছেন তারা। এ জন্য লবণ চাষকে সারাসরি কৃষির আওতায় অন্তর্ভুক্তি করা প্রয়োজন। লবণ চাষ এলাকার মাটি ও পানি পরীক্ষাসহ সুষ্ঠু গবেষণা প্রয়োজন। কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া একটি লবণ বোর্ড গঠনে চাষিদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

লেখক: শাইখ সিরাজ
পাতাটি ২৬২৯ প্রদর্শিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

»  আগামী বাজেটে কৃষিখাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে

»  পেঁপের নতুন জাত উদ্ভাবন

»  কৃষিতে ৫৫ দফা সুপারিশ

»  ফরিদপুরের কালো সোনা

»  গ্রীষ্মকালীন তুলার নতুন জাত উদ্ভাবন