২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭


হোম   »   কৃষি তথ্য   »   ধান-গম-ভুট্টা চাষ  
আমন ধানে পোকার আক্রমণ, কী করবেন?

আমন ধানে পোকা লেগেছে। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের কিছু জমিতে বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণ দেখা গেছে। পাবনাসহ কিছু জায়গায় মাজরা পোকার আক্রমণ লক্ষ করা যাচ্ছে। ফেনীসহ কিছু এলাকায় আবার পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণের খবর বেরিয়েছে। আক্রন্ত আমন ক্ষেতের চাষি ভাইয়েরা বড়ই চিন্তার মধ্যে আছেন। এ অবস্থায় কী করবেন?

বাদামি গাছফড়িং নিয়ন্ত্রণে করণীয় : আমন ধানের জমি তৈরির সময় বেশি পানি ব্যবহার করায় জমি খুব ভালোভাবে সমতল করা হয় না। তাই পরে যখন ইউরিয়া সার দেয়া হয় তখন পানি কমে এলে সারের খানিকটা পানির সাথে গিয়ে নিচু জায়গায় জমা হয়। ফলে জমির নিচু জায়গায় জমে থাকা পানি ও সারের প্রভাবে গাছের বাড়বাড়তি উঁচু অংশের তুলনায় বেশি হয়। কুশি বেশি হয়ে গাছ ঝোপালো হয়ে যায়। পটাশ, দস্তা, জিপসাম ইত্যাদি সার প্রয়োগ না করায় বা কম দেয়ায় ধানগাছের বালাইয়ের প্রতি প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, গাছ কম শত্তপ্ত হয়। ফলে গাছে সহজেই বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণ হয়। বাদামি গাছফড়িং খুব ছোট পোকা, বাদামি রঙের এবং দলবেঁধে ধান গোছার গোড়ার দিকে থাকে। গোড়ার পাতার খোল থেকে বাদামি গাছফড়িং ও তার বাচ্চা দলে দলে গাছের রস চুষে খায়। ফলে গাছ হলুদ রঙ ধারণ করে ও শুকিয়ে যায়। সাধারণত বাদামি গাছফড়িং যেখানে লাগে সেখানে চাকের মতো খানিকটা জায়গার ধানগাছ শুকিয়ে ফেলে। দূর থেকে দেখলে বাজ পোড়ার মতো মনে হয়। অর্থাৎ এ পোকার আক্রমণে ক্ষেতের মাঝে মাঝে তাওয়ার মতো লালচে হয়ে ধানগাছ বসে যায়।

এ অবস্থায় কোনোভাবেই জমিতে আর ইউরিয়া সার দেয়া ঠিক নয়। সম্ভব হলে জমে থাকা পানি ক্ষেত থেকে বের করে দিতে হবে। মরে যাওয়া বা আক্রন্ত গাছের খোলপাতা হাতে টেনে পরিষকার করে জমিতে আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য চার থেকে পাঁচ সারি পরপর ধানগাছের সারি বরাবর বিলি কেটে ফাঁকা করে দিতে হবে। তাওয়া ধরে পুড়ে যাওয়া অংশে অবশ্যই বাদামি গাছফড়িংয়ের আস্তানা থাকে। তাই সে অংশে ও তার খানিকটা আশপাশের গাছের গোড়ায় ভালো করে ভিজিয়ে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন্ল মিপসিন, সপসিন, অসবেক, ম্যালাথিয়ন, ফেনিট্রথিয়ন ইত্যাদি সেপ্র করতে হবে। আক্রমণের মাত্রা খুব বেশি হলে পুরো ক্ষেতে ফুরাডান ৫জি বা ফিপ্রোনিল ৩জি (প্রতি বিঘায় ১.৩ কেজি হারে) ছিটিয়ে দিন।

মাজরা পোকা নিয়ন্ত্রণে করণীয় : মাজরাপোকা ধানগাছের গোড়ায় কুশি ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে মাইজ বা ডিগপাতা কেটে দেয়। ফলে ডিগপাতা মরে যায়। একে বলে ‘মরা ডিগ’। শীষ বের হওয়া বা দানা গঠনপর্যায়ে মাজরা পোকার আক্রমণে আক্রান্ত শীষ শুকিয়ে সাদা হয়ে যায় ও খাড়া থাকে। একে বলা হয় ‘সাদা শীষ’। যদি কুশি বৃদ্ধিপর্যায়ে শতকরা ১০ ভাগ ডিগপাতাও মাজরার আক্রমণে এভাবে মরে যায় তাহলেও চাষি ভাইদের চিন্তার কিছু নেই। কেননা কিছু দিনের মধ্যেই গাছ নতুন কুশি ছেড়ে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ চাষিভাই দুই থেকে তিন শতাংশ বা পাঁচ থেকে ছয়টি গুছিতে একটা মরা ডিগ দেখলেই চিন্তায় মরে যান। অযথা কীটনাশক ছিটিয়ে টাকা নষ্ট করেন। যেসব ডিগ বা কুশি মরে গেছে, হাজার কীটনাশক দিলেও সেগুলো আর জীবিত হবে না।

মাজরা পোকা আসে দফায় দফায়, ঝাঁকে ঝাঁকে। তাই একবারে তারা যে ডিম পেড়ে রেখে যায় সে ডিম ফুটেই মাজরার বাচ্চা বের হয় ও কুশির বা পাশকাঠির গোড়ায় ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে কুশি নষ্ট করে দেয়। কাজেই ক্ষতির লক্ষণ দেখা দেয়ার পর অযথা কীটনাশক সেপ্র করে কোনো লাভই হয় না। তাই আগে থেকেই সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারলে আক্রমণ অনেক কমে যায়। ফসলও ক্ষতি হওয়া থেকে বাঁচে। সে জন্য চারা লাগানোর পরই ক্ষেতে পাখি বসার জন্য ডাল বা কঞ্চি পুঁতে দিলে তাতে ফিঙেসহ অন্যান্য পাখি বসে মাজরা পোকা ধরে খায়। ফলে মা মাজরা ধানগাছের পাতায় আর ডিম পাড়তে পারে না। একটা ফিঙে পাখি রোজ গড়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০টা মা মাজরা ধরে খেতে পারে। একটা মা মাজরা ১০০ থেকে ১৫০টা ডিম পাড়ে। এর যদি অর্ধেকও ফুটে বাচ্চা বের হয় ও কুশি ছিদ্র করে ঢোকে, তবে একটা মা মাজরার বাচ্চা ৫০ থেকে ৭৫টা কুশি নষ্ট করে দিতে পারে। তাই ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করলে এবং ক্ষেতে কোনো কীটনাশক সেপ্র না করলে মাজরা নিয়ন্ত্রণের জন্য আর কোনো ব্যবস্থা নেয়ার দরকার হয় না। আক্রন্ত ক্ষেতে মরা ডিগ বা সাদা শীষ দেখলে ক্ষেতে নেমে প্রথমেই সেগুলোর মাথা ধরে টান দিয়ে তুলে ফেলুন। তবে তুলে ফেলা ওসব মরা ডিগ বা সাদা শীষ ভুলেও কখনো জমিতে বা আইলে ফেলে রাখবেন না। মাটিতে পুঁতে ফেলুন, না হয় পুড়িয়ে ফেলুন। জমিতে বা আশপাশে ফেলে রাখলে সেখান থেকে আবার জমিতে যাবে ও নতুন কুশি আক্রমণ করবে। যদি গাছ কুশি অবস্থায় থাকে বা থোড় না হয়, তাহলে ক্ষেতে এক কিস্তি ইউরিয়া সার দিন। সাথে ফুরাডান, বাসুডিন ইত্যাদি দানাদার কীটনাশক ছিটিয়ে দিতে পারেন। তবে কীটনাশক সেপ্র করবেন না। সম্ভব হলে দু-চার দিন সনধ্যায় জমি থেকে কিছুটা দূরে আলোকফাঁদ পাতুন। এতে মা মাজরা আলোতে আকৃষ্ট হয়ে মারা যাবে। সবশেষে মাজরা মারার একটা মন্ত্র বলে দিই, মন্ত্রটা হলো্ল ‘দিনে লাঠি (কঞ্চি) সনধ্যায় বাতি, এই হলো মাজরা মারার কেরামতি।’

যে জিনিসগুলো অবশ্যই মনে রাখবেন
- বাদামি গাছফড়িংয়ের আত্রপ্তমণ খুব বেশি হলে জমিতে আর ইউরিয়া সার দেবেন না। ক্ষেতে পানি জমে থাকলে বের করে দিতে হবে। - মাজরা পোকায় আত্রপ্তান্ত ক্ষেতে অযথা কীটনাশক ছিটিয়ে টাকা নষ্ট করবেন না। কারণ মরে যাওয়া ডিগ বা কুশি হাজার কীটনাশক দিলেও জীবিত হবে না।
- তুলে ফেলা মরা ডিগ বা সাদা শীষ ভুলেও কখনো জমির আইলে ফেলে রাখবেন না। ওগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলুন, না হয় পুড়িয়ে ফেলুন।
- দানাদার কীটনাশক ব্যবহার করলেও কোনো তরল কীটনাশক সেপ্র করবেন না। তাতে মাজরার ডিম, কিড়া ও পুত্তলির পরজীবিতার মাধ্যমে যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বোলতা প্রাকৃতিকভাবে নষ্ট করে, সেসব বোলতা মরে যাবে।
- দিনে লাঠি (কঞ্চি) সনধ্যায় বাতি, এই হলো মাজরা মারার কেরামতি।

লেখক : মৃত্যুঞ্জয় রায়
পাতাটি ২৯৪৪ প্রদর্শিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

»  হাইব্রিড ধান চাষ পদ্ধতি

»  খরাসহিষ্ণু ধান

»  বোরো ধানের পরিচর্যা, সেচ ও সার প্রয়োগ

»  বোরো ধান চাষের নতুন প্রযুক্তি

»  আমন ধানে পোকার আক্রমণ, কী করবেন?